সরকারি ঋণবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা

দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন বন্ড থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা

বাজেট ঘাটতির কারণে ক্রমেই বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ। এর প্রভাব পড়ছে দেশটির আর্থিক বাজারে।

বাজেট ঘাটতির কারণে ক্রমেই বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ। এর প্রভাব পড়ছে দেশটির আর্থিক বাজারে। অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে স্বল্পমেয়াদে লাভজনক ট্রেজারি বন্ডের দিকে ঝোঁক বেড়েছে বিনিয়োগকারীদের। বিপরীত দিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বন্ড থেকে বিনিয়োগ আস্থা কমে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ফান্ড বা তহবিল থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। কভিড-পরবর্তী সময়ে এতদিন এতটা দ্রুতগতিতে এ ধরনের বন্ড বা তহবিল থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিতে দেখা যায়নি বিনিয়োগকারীদের। খবর এফটি।

গবেষণা সংস্থা ইমার্জিং পোর্টফোলিও ফান্ড রিসার্চের (ইপিএফআর) তথ্যানুসারে, সরকারি ও করপোরেট ঋণ অন্তর্ভুক্ত এমন দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন বন্ড তহবিল থেকে চলতি এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার তুলে নেয়া হয়েছে।

কভিড-১৯ মহামারীর সময় সারা বিশ্বের আর্থিক বাজারে স্থবিরতা দেখা যায়। ওই সময়ের চরম অস্থিরতার পর এবারই প্রথম মার্কিন বন্ড তহবিল থেকে সবচেয়ে বড় পরিমাণ অর্থ প্রত্যাহার হতে চলেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। গত ১২ প্রান্তিক বা তিন বছরে এ বাজারে গড়ে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার। এখন তার উল্টোটা দেখা যাচ্ছে। এ পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন বন্ড বাজারে একটি পালাবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ফান্ড বহুল চর্চিত বিষয়। ফলে এখান থেকে বড় অংকের অর্থ প্রত্যাহার মার্কিন অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্যমতে, এমন এক সময় অর্থ প্রত্যাহার হচ্ছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়ে চলেছে। অবশ্য ফান্ডপ্রবাহ পুরো মার্কিন বন্ড বাজারের ক্ষুদ্র একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। তা সত্ত্বেও এটি বিনিয়োগ মনোভাবে পরিবর্তন আসার ইঙ্গিত দেয়।

বন্ডকেন্দ্রিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ডাবললাইনের বিশ্লেষক বিল ক্যাম্পবেলের মতে, বন্ড ফান্ড থেকে অর্থ সরিয়ে নেয়া আরো বিস্তৃত সমস্যার লক্ষণ। দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন ঋণের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার মূল কারণ সরকারের ঋণ পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতির শঙ্কা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এটি সাময়িক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ।

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, কংগ্রেসে বিবেচনাধীন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বিগ, বিউটিফুল’ কর সংস্কার বিল আগামী এক দশকে মার্কিন সরকারি ঋণে ট্রিলিয়ন ডলার যুক্ত করবে। ফলে অর্থ বিভাগকে বিপুল পরিমাণ বন্ড বিক্রি করতে হবে, যার প্রভাব পড়বে বিনিয়োগকারীদের আস্থায়। অবশ্য হোয়াইট হাউজ দাবি করে আসছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ও ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত উচ্চ শুল্ক কিছু সুবিধা দেবে। এতে সরকারি ঋণ কমে আসবে।

একই সঙ্গে বাজারে অংশগ্রহণকারীরা আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের বড় বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর আরোপিত শুল্ক মূল্যস্ফীতি বাড়াবে, যা বন্ড বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় হুমকি।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের চিফ ক্রেডিট স্ট্র্যাটেজিস্ট লতফি কারুই বলেন, ‘মার্কিন বাজার দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে টেকসই হবে কিনা সে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহার তারই প্রতিফলন।’

সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান পিজিআইএমের গ্লোবাল বন্ড বিভাগের প্রধান রবার্ট টিপ বলেন, ‘এক অস্থির পরিবেশ বিরাজ করছে। মূল্যস্ফীতি এখনো ফেডারেল রিজার্ভের লক্ষ্য ২ শতাংশের ওপরে এবং সর্বত্র সরকারের ঋণ জোগানের চাপ দৃশ্যমান। ফলে ট্রেজারি কার্ভের দীর্ঘপ্রান্তে বিনিয়োগ নিয়ে দ্বিধা ও অস্থিরতা বাড়ছে।’

বিশ্লেষকরা বলে থাকেন, দীর্ঘমেয়াদি বন্ড মূল্যস্ফীতির প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এ ধরনের বিনিয়োগে অনেক বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট সুদহার বজায় থাকে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি বেশি হলে নির্দিষ্ট হারে সুদ পাওয়ায় এর প্রকৃত মূল্য কমে যায়।

এ উদ্বেগ বন্ডের দামের পারফরম্যান্সেও প্রতিফলিত হয়েছে। ব্লুমবার্গের একটি বিস্তৃত সূচক অনুসারে চলতি প্রান্তিকে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন ঋণের মূল্য প্রায় ১ শতাংশ কমেছে। তবে গত এপ্রিলে ডোনাল্ড ট্রাম্প উচ্চ শুল্ক ঘোষণা করায় বাজারের যতটা ক্ষতি হয়েছিল তা কিছুটা কাটিয়ে ওঠা গেছে।

দীর্ঘমেয়াদি বন্ড তহবিল থেকে অর্থ সরিয়ে নেয়ার বিপরীতে স্বল্পমেয়াদি মার্কিন বন্ড তহবিলে বিনিয়োগ বাড়ছে। ইপিএফআরের তথ্যানুসারে, চলতি এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ খাতে ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ঢুকেছে। এসব ফান্ড বিনিয়োগকারীদের উচ্চহারে সুদ দিচ্ছে। কারণ চলতি বছরে স্বল্পমেয়াদি সুদহার উচ্চ পর্যায়ে রেখেছে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ।

অবশ্য দীর্ঘমেয়াদি বন্ড বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ততটা চরম অবস্থান নিতে রাজি নন আরবিসি গ্লোবাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের অধীন ব্লুবে ইউএস ফিক্সড ইনকামের প্রধান আন্দ্রেজ স্কিবা। তিনি বলেন, ‘এখন বিনিয়োগকারীরা আন্তর্জাতিকভাবে বন্ড হোল্ডিংয়ে বৈচিত্র্য আনতে চাইতে পারেন। তবে আমরা মনে করি না যে ট্রেজারি বাজারের অবসান ঘটছে। বিশ্বব্যাপী ফিক্সড ইনকাম পোর্টফোলিওতে ট্রেজারি এখনো মুখ্য ভূমিকা রাখবে।’

বাজারে কিছু পরিবর্তন যে আসতে পারে তা নিয়ে আন্দ্রেজ স্কিবা দ্বিমত নন। তার মতে, ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে নতুন দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ড কিনতে গেলে বিনিয়োগকারীরা এখন আগের তুলনায় বেশি সুদ চাইতে পারেন। তবে দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের বাজারে কিছু অস্থিরতা থাকলেও এখনো বড় কোনো ধস বা বিপর্যয়ের আভাস দেখা যাচ্ছে না।

আরও